ঠাকুর ছিলেন আড়ম্বরহীন সাধারণ মানুষের মত। বাহ্যিক আবরণের কোন বালাই ছিল না। প্রথম দর্শনলাভের সৌভাগ্যের দিন হইতে যত দিন সুস্থ দেহে ছিলেন একখানি ধূতি ও একটি চাদর তাঁহার পরিধেয় দেখিয়াছি। শীতে-গ্রীষ্মে সব্বদাই একই পোশাকে থাকিতেন। জীবনের শেষ ভাগে আশ্রিতরা তাঁহাকে গরম জামা, কাপড় প্রভৃতিতে ভুষিত করিতেন। ঐগুলি তিনি ইচ্ছামত দান করিতেন। পুঁথিগত বিদ্যা তাঁহার অবিদিত ছিল বলা চলে। তবু তিনি সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ ছিলেন। মহান আত্মার ভাবাবেশে তিনি কথা বলিতেন। তাঁহার সন্মুখে উপস্থিত হইলে সকলেরই মস্তক আপনিই অবনত হইত। মহান সঙ্গীতের ন্যায় তাঁহার কন্ঠস্বর। ভাবোচ্ছ্বাসগুলি স্বর্গের দৃশ্ব্যের ন্যায়। সে স্বর্গে সকল মানব প্রেমে সম্মিলিত। পাপী, অজ্ঞ, মুর্খ, সমাজের পরিত্যক্ত যত আবর্জনা সবাইকে তিনি কোলে টানিয়া লইতেন। যাহা তিনি স্পর্শ করিয়াছেন, তাহাই পবিত্র হইয়াছে। এমন কোন মলিনতা নাই যাহা সেই পুণ্যের আলোকে একটি কলঙ্ক রেখাপাত করিতে পারে। সুগভীর জ্ঞান ও পবিত্রতা তাঁহার নিকট নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় স্বাভাবিক। আপন-পর তাঁহার নিকট অবিদিত ছিল। সবাই তাঁহার নিকট সমান; সর্ব্বাধিক প্রিয় তাঁহার কেহই ছিল না, তাঁহার নিকট যিনি থাকিতেন, মনে করিতেন তিনি ঠাকুরের অতি প্রিয় জন।

বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাইকে তিনি ‘আপনি’ বলিয়া সম্বোধন করিতেন। এমন কি বাড়ির ঝি, ভৃত্য বা পরিচারিকা, রাস্তার কুলি-মজুর, যাহাদিগকে আমরা তাচ্ছিল্যভরে ‘তুমি’ বা ‘তুই’ বলিয়া সম্বোধন করি, তাহাদিগকেও ঠাকুর ‘আপনি’ বলিতেন এবং সসন্মানে নিজের নিকটে আনিয়া বসাইতেন। সকল জাতি ধর্ম্মের মধ্যে তিনি সত্যকে দেখিতেন। যাহা কিছু মঙ্গল, যাহা কিছু সুন্দর সবই তাঁহার মধ্যে বর্ত্তমান। প্রীতি, ভক্তি, ত্যাগ ও সেবায় তাঁহার সমগ্র জীবন নিবেদিত ছিল। যেখানে তিনি উপস্থিত থাকিতেন সেখানে সকল দু: খ ও অনুযোগ স্তব্ধ হইয়া যাইত। স্নান করিতেন না। কেবল মজ:ফরপুরে থাকাকালীন তিন দিন ঠাকুরের সমস্ত শরীরে দধি মাখাইয়া স্নান করান হইয়াছিল। পুরীতে সমস্ত দিন সমুদ্র সৈকতে বালির মধ্যে বসিয়া থাকার জন্য সর্ব্বশরীরে বালি ও কাদা লাগিত। ঐ সময় ২২ দিন প্রত্যহই ঠাকুরকে স্নান করান হইত। কেহ জোর করিয়া তাঁহার পরিধেয় কাপড়-জামা পরিবর্ত্তন না করিলে ঐভাবেই থাকিতেন। যেখানে যখন অবস্থান করিতেন তাহারাই পরিধেয় বস্ত্রগুলি পরিস্কার করিয়া দিতেন। কোন দিন তাঁহাকে অন্নগ্রহণ করিতে দেখি নাই। বরাবরই সামান্য ফল-মূল, দধি, দুগ্ধ, সন্ধেশ এবং ক্বচিত লুচি-তরকারী ভোগে লাগিত; মানকচু, ওলকচু, কাঁচাকলা, বিচিকলা, ঢেড়স, মর্ত্তমান কলা ও চালতার আচারও কখন কখন বিশেষ পছন্দ করিতেন, মনে হইত। ঠাকুর আমাদের বাসায় অবস্থানকালীন বা ঠাকুরের সহিত কোথাও গেলে সর্ব্বদাই ঠাকুরের নিকটে থাকিতে হইত। বিনানুমতিতে কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। দৈবাৎ কোথাও গেলে কৈফিয়ৎ দিতে হইত।
{শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর সম্পর্কে শ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার}